১২ এপ্রিল ২০২৫, শনিবার, ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশের ইতিহাসের এক স্মরণীয় এবং বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় — 'March for Gaza'। এই সমাবেশে প্রায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ অংশগ্রহণ করেন, যার লক্ষ্য ছিল গাজার জনগণের ওপর ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিশ্বজনীন প্রতিবাদ জানানো এবং ফিলিস্তিনের মুক্তির পক্ষে বাংলাদেশের জনগণের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান প্রকাশ করা।
পটভূমি: গাজার সংকট ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া
২০২৪ সালের শেষভাগ থেকে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান ব্যাপক আকার ধারণ করে। শত শত নিরীহ নারী, শিশু এবং বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারান। গাজার অবকাঠামো বিধ্বস্ত হয় এবং মানবিক বিপর্যয় চরমে পৌঁছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঢেউ উঠে, যার মধ্যে বাংলাদেশের 'March for Gaza' সবচেয়ে বড় এবং সুসংগঠিত প্রতিবাদ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
সমাবেশের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি
'March for Gaza' আয়োজনের উদ্যোগ নেয় বিভিন্ন ইসলামী সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিক সমাজ। সমাবেশের জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে বেছে নেওয়া হয় — যা ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
আয়োজকরা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের জন্য আহ্বান জানান এবং পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে ফিলিস্তিনের পতাকা, প্রতীকী কফিন, কালো ব্যাজ এবং পোস্টারের মাধ্যমে গাজার মানুষের ওপর চলমান নির্যাতন বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়।
সমাবেশের দিন: বিশাল জনসমাগম
১২ এপ্রিল ২০২৫, সকাল থেকেই ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আসতে শুরু করেন।
-
বিকেল ৩টায় আনুষ্ঠানিকভাবে সমাবেশ শুরু হয়।
-
অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল ফিলিস্তিনের পতাকা, মাথায় ছিল কেফিয়া (ফিলিস্তিনি স্কার্ফ)।
-
মঞ্চে উঠে বক্তৃতা দেন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ: রাজনৈতিক নেতা, ইসলামি চিন্তাবিদ, মানবাধিকার কর্মী, ক্রীড়াবিদ ও শিক্ষার্থীরা।
বিশেষ অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শেখ আহমাদুল্লাহ, মিজানুর রহমান আজহারী, ক্রিকেটার মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, মেহেদী হাসান মিরাজ, এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব।
সমাবেশ শান্তিপূর্ণ ছিল, তবে এর আবেগ ছিল প্রবল। স্লোগান উঠছিল:
"গাজা তুমি একা নও!"
"ফিলিস্তিনের মুক্তি চাই!"
"ইসরায়েলের বর্বরতার বিরুদ্ধে বিশ্ববিবেক জাগো!"
ঘোষণাপত্র ও দাবিসমূহ
সমাবেশ শেষে মাহমুদুর রহমান একটি ১৬ দফা দাবিসমৃদ্ধ ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এতে চারটি স্তরে দাবিগুলি ভাগ করা হয়:
১. আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি দাবি:
-
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচার নিশ্চিত করা।
-
১৯৬৭ সালের পূর্ববর্তী সীমান্তে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
-
পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান।
-
অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় মানবিক সহায়তা অবিলম্বে পাঠানো।
২. মুসলিম উম্মাহর প্রতি আহ্বান:
-
ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা।
-
মুসলিম দেশগুলোকে একত্রিত হয়ে ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা।
-
গাজার জনগণের সহায়তার জন্য বিশেষ তহবিল গঠন।
৩. বাংলাদেশের সরকারের প্রতি দাবি:
-
পাসপোর্টে 'except Israel' শর্ত পুনর্বহাল করা।
-
ইসরায়েলের যেকোনো সঙ্গে চুক্তি বা ব্যবসায়িক লেনদেন নিষিদ্ধ করা।
-
গাজায় সরাসরি ত্রাণ ও চিকিৎসা সামগ্রী পাঠানো।
-
ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রামকে সমর্থন জানিয়ে জাতীয় সংসদে প্রস্তাব গৃহীত করা।
৪. নাগরিকদের প্রতি আহ্বান:
-
গাজার সমর্থনে নিরবিচারে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া।
-
ফিলিস্তিনের ইতিহাস ও সংগ্রাম শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা।
-
ইসরায়েলি পণ্য বয়কট করা এবং গাজার জন্য অর্থ ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
সরকারের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া
সমাবেশের প্রভাব ছিল তাৎক্ষণিক। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষণা করে যে, বাংলাদেশের পাসপোর্টে আবারও 'except Israel' শর্ত যোগ করা হয়েছে — যা ২০২৪ সালে বাতিল করা হয়েছিল।
এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণের আবেগের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ফিলিস্তিনের প্রতি দীর্ঘদিনের সমর্থনের প্রতিফলন।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ ইয়াহিয়া রমাদান এই সমাবেশের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন:
"March for Gaza বাংলাদেশের জনগণের মানবিকতার এক অনন্য প্রকাশ। এই সমাবেশ বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছে, গাজার মানুষ একা নয়।"
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম যেমন Al Jazeera, BBC, Reuters, ও AP এই সমাবেশের খবর ফলাও করে প্রচার করে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মত একটি মুসলিম প্রধান দেশে এত বিশাল পরিসরে এবং শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ হওয়া বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়।
সমাবেশের প্রতীকী দিক
সমাবেশটি শুধু একটি প্রতিবাদ ছিল না — এটি ছিল ফিলিস্তিনের মানুষের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং বিশ্বব্যাপী ন্যায়বিচারের জন্য একাত্মতার ঘোষণা।
প্রতীকী কফিন, বাচ্চাদের হাতে ফিলিস্তিনের পতাকা, নারীদের স্লোগানে অংশগ্রহণ এবং তরুণদের ফিলিস্তিনের ঐতিহাসিক ছবি বহন করে মিছিল করা — সবকিছু মিলে এটি হয়ে ওঠে এক আবেগঘন স্মরণীয় মুহূর্ত।
উপসংহার
'March for Gaza' শুধুমাত্র একটি প্রতিবাদ সমাবেশ ছিল না, এটি ছিল বাংলাদেশের জনগণের নৈতিক অবস্থান, মানবতার প্রতি তাদের অঙ্গীকার এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রতি সমর্থনের জোরালো প্রকাশ।
বিশ্বের ইতিহাসে যখনই নির্যাতিত মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর কথা বলা হবে, বাংলাদেশের এই সমাবেশ সেখানে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে — দূর দেশ হলেও, গাজা তাদের হৃদয়ে রয়েছে। এবং ন্যায়ের জন্য তাদের আওয়াজ কখনও থামবে না।

.jpg)
0 Comments