Ticker

6/recent/ticker-posts

Ad Code

খুলনা অঞ্চলের সড়কগুলো মৃত্যুফাঁদে পরিণত: অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও উপেক্ষার করুণ চিত্র

 


বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুলনা অঞ্চল, যা দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক ও কৃষিপ্রধান এলাকা হিসেবে পরিচিত, এখন আর্থসামাজিক অগ্রগতির বদলে পরিচিত হচ্ছে আরেক নামে—“মৃত্যুফাঁদ”। কারণ, এখানকার অধিকাংশ সড়ক এখন এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ ও ভাঙাচোরা যে, প্রতিদিনই ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা, নষ্ট হচ্ছে যানবাহন, সময় অপচয় হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, আর ভোগান্তিতে দিন কাটাচ্ছে হাজার হাজার যাত্রী।

এই সড়ক ব্যবস্থার করুণ চিত্র কেবল একটি অব্যবস্থাপনার নয়, বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক উদাসীনতার ধারাবাহিক প্রতিফলন।


খুলনা অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো: ভাঙাচোরা ও অনিরাপদ

খুলনা বিভাগের অন্তর্গত খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, নড়াইল, মাগুরা ও ঝিনাইদহ জেলার প্রায় সব প্রধান ও আঞ্চলিক সড়কেই একই চিত্র:

খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়ক

বারবার সংস্কার করেও এ সড়কের কিছু কিছু স্থানে বড় বড় গর্ত, ধ্বসে যাওয়া কালভার্ট ও বেহাল ড্রেনেজ ব্যবস্থা দুর্ঘটনার হুমকি তৈরি করছে।

খুলনা-যশোর মহাসড়ক

দেশের অন্যতম ব্যস্ততম রুট হলেও প্রায় ৩০ কিলোমিটার রাস্তায় খানাখন্দ এবং অপ্রশস্ত লেনের কারণে বাস-ট্রাক চলাচল প্রতিদিন ঝুঁকির মধ্যে।

খুলনা-বাগেরহাট-রূপসা সড়ক

মাছ ও কাঁকড়া পরিবহনের প্রধান রুট হওয়া সত্ত্বেও বছরের অধিকাংশ সময় এটি যান চলাচলের অনুপযোগী থাকে।


দুর্ঘটনার ভয়াবহ পরিসংখ্যান

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে খুলনা বিভাগের সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন প্রায় ৫২০ জন। এর মধ্যে খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কেই প্রাণ হারিয়েছেন ১৮০ জনের বেশি। অনেক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের একাধিক সদস্য নিহত হয়েছেন, যা পুরো এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া ফেলেছে।

একজন স্থানীয় সাংবাদিক বলেন:

“প্রতিটি বৃষ্টির পর সড়কগুলো আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। গর্তে পড়ে অটোরিকশা উল্টে গেলে যাত্রী মারা যান—এ দৃশ্য এখন খুলনার সাধারণ বাস্তবতা।”



সংস্কার কার্যক্রমের দুর্বলতা ও অভিযোগ

দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, এলজিইডি ও সড়ক ও জনপথ বিভাগের সংস্কার প্রকল্পগুলোতে। যেমন:

নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহার

৩-৬ মাসের মধ্যেই নতুন রাস্তা আবার ভেঙে যাওয়া

টেন্ডারপ্রাপ্ত ঠিকাদারদের পক্ষপাতমূলক মনোভাব

পর্যাপ্ত মনিটরিং না থাকা

একজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন:

“আমাদের শুধু কাজ শেষ করতে বলা হয়, টেকসই করতে নয়। বরাদ্দের বড় অংশই চলে যায় লবিং, কমিশন আর উপরি খরচে।”


ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ ও কৃষকরা

খুলনা অঞ্চল একটি কৃষিপ্রধান এলাকা। এখানে প্রচুর মাছ, ধান, সবজি উৎপন্ন হয়। ভাঙা রাস্তার কারণে:

কৃষকরা পণ্য পরিবহনে দ্বিগুণ ভাড়া দিতে বাধ্য হচ্ছেন।


ফসল সময়মতো বাজারে না পৌঁছানোয় ন্যায্য দাম পাওয়া যাচ্ছে না।

অতিরিক্ত ভাড়ায় দ্রব্যমূল্যও বেড়ে যাচ্ছে।

একন মাছ চাষি বলেন:

“রাস্তায় গাড়ি থেমে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তখন বরফ গলে যায়, মাছ নষ্ট হয়ে যায়। আমাদের হাজার হাজার টাকা ক্ষতি।”


পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা

খুলনা বিভাগের সড়কে প্রতিদিন চলে অসংখ্য বাস, ট্রাক, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল। কিন্তু—

ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ প্রায় নেই বললেই চলে

ডিভাইডার না থাকায় মুখোমুখি সংঘর্ষ বেড়েছে

ওভারলোডেড গাড়ির কারণে রাস্তায় ফাটল দ্রুত তৈরি হয়

লাইট বিহীন রাতে অন্ধকারে গর্তে পড়ে যান দুর্ঘটনা

একজন পরিবহন শ্রমিক বলেন:

“সড়কে লাইন নেই, সিগনাল নেই, নিয়ম নেই—এই অবস্থায় দুর্ঘটনা না ঘটলে বরং অবাক হতে হয়।”


প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সড়ক উন্নয়ন নিয়ে জনপ্রতিনিধিদের পদক্ষেপ অনেকটাই প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ। সংসদে একাধিকবার খুলনা অঞ্চলের রাস্তাঘাটের করুণ চিত্র তুলে ধরা হলেও বাস্তব অগ্রগতি চোখে পড়েনি।

একজন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বলেন:

“প্রতিটি প্রকল্পে রাজনৈতিক প্রভাব থাকে, ফলে বাস্তব সমস্যা গুরুত্ব পায় না। লোক দেখানো কিছু সংস্কার হলেও, পুরো সড়ক ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন আসেনি।”


প্রাকৃতিক কারণ না, মানবসৃষ্ট দুর্যোগ

খুলনার রাস্তাগুলোর বেহাল দশা নিয়ে কেউ কেউ প্রাকৃতিক দুর্যোগকে দায়ী করেন, যেমন বৃষ্টি, বন্যা, নদীভাঙন ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই সমস্যাগুলোর বেশিরভাগ মানবসৃষ্ট:

অপরিকল্পিত ড্রেনেজ

সড়ক নকশায় ত্রুটি

নির্মাণে দুর্বল উপকরণ

রক্ষণাবেক্ষণের অভাব


সমাধান কী হতে পারে?

সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ছাড়া উপায় নেই। প্রস্তাবনা:

দীর্ঘমেয়াদি সড়ক সংস্কার মাস্টারপ্ল্যান তৈরি

দুর্নীতিমুক্ত টেন্ডার ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা

স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণে মনিটরিং সেল গঠন

টেকসই উপকরণ দিয়ে নির্মাণ বাধ্যতামূলক করা

সড়কপথ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন (ডিভাইডার, সিগনাল, ক্যামেরা)



জনগণের প্রত্যাশা ও প্রশ্ন

খুলনা অঞ্চলের জনগণ প্রশ্ন তুলছে—তারা কী শুধু কর, ভোট ও ভোগান্তির জন্য? কেন তাদের জীবন ও জীবিকা নিয়ে কেউ ভাবে না? কেন বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও বাস্তব অগ্রগতি দেখা যায় না?

একজন স্কুলশিক্ষক ক্ষোভের সঙ্গে বলেন:

“আমরা যদি রাজধানীর বাসিন্দা হতাম, তাহলে কি এই দুর্দশা হতো? আমাদের জীবন কি ততটা মূল্যবান নয়?”


উপসংহার

খুলনা অঞ্চলের সড়কব্যবস্থা এখন শুধু যাতায়াতের সমস্যা নয়, বরং এটি একটি মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন অমূল্য জীবন হারাচ্ছে মানুষ, দুর্বল হচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতি, এবং ভাঙছে জনগণের প্রশাসনের ওপর আস্থা।

এখনই সময় সরকার, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নেয়—খুলনার মানুষ আর কতকাল মৃত্যুফাঁদে চলাচল করবে?

Post a Comment

0 Comments