২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় রাজপথ উত্তাল হয়ে উঠেছে। শাহবাগ, যা বিগত এক দশকে দেশের নাগরিক প্রতিবাদের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, আজ আবার নতুন এক রাজনৈতিক জাগরণ ও আন্দোলনের মুখ দেখছে। হাজারো মানুষ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অবস্থান করছে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে। “জুলাই গণঅভ্যুত্থান – দ্বিতীয় ধাপ” নামে সংগঠিত এই আন্দোলন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
আন্দোলনের সূত্রপাত
শাহবাগে চলমান এই গণঅবস্থান কর্মসূচির পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ ও রাজনৈতিক অনাস্থা। ২০২৪ সালের শেষের দিকে দেশে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হলেও জনসাধারণের বৃহৎ অংশের মধ্যে এই বিশ্বাস জন্মায়নি যে, সরকার প্রকৃত অর্থে নিরপেক্ষ ও জনবান্ধব। পূর্ববর্তী সরকারের – বিশেষত আওয়ামী লীগের – একনায়কতান্ত্রিক শাসন, নির্বাচন ব্যবস্থার দুর্বলতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণের অভিযোগ, এবং সর্বোপরি দমন-পীড়নমূলক আইনের প্রয়োগ এই আন্দোলনের পেছনে প্রাথমিক অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
“জুলাই গণঅভ্যুত্থান” নামে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ২০২5 সালের শুরুতে, তার প্রথম ধাপ ছিল এক বিশাল ছাত্র ও নাগরিক আন্দোলন। এর ধারাবাহিকতায় এখন শুরু হয়েছে দ্বিতীয় ধাপ – অধিক সংগঠিত, অধিক জনসম্পৃক্ত, এবং অধিক রাজনৈতিকভাবে সচেতন।
শাহবাগের অবস্থান কর্মসূচি
গত কয়েক দিন ধরে শাহবাগ মোড়ে হাজার হাজার মানুষ অবস্থান করছে। তরুণ-তরুণী, বৃদ্ধ, শিশু, নারী – সবাই একক কণ্ঠে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছে। মাইক্রোফোনে বার বার ভেসে আসছে স্লোগান:
“এই আওয়ামী লীগ দেশের জন্য হুমকি, নিষিদ্ধ করো এখনই।”
সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা ফেস্টুন, ব্যানার, প্ল্যাকার্ড নিয়ে হাজির হয়েছেন। অনেকেই আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ঘটে যাওয়া গুম, খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতির ঘটনার তালিকা নিয়ে প্রতিবাদ করছেন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, আন্দোলনকারীদের মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সাবেক ছাত্রনেতা, বেসরকারি চাকরিজীবী, লেখক, সাংবাদিক, এমনকি কিছু অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিচ্ছে একাধিক নতুন প্রজন্মের নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক সংগঠন।
আজকের কর্মসূচি
আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী "গণমানুষের ঐক্য" নামের একটি প্ল্যাটফর্ম আজ ১০ মে ২০২৫ বিকেল ৩টায় সারাদেশব্যাপী একযোগে বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও রংপুরে একযোগে "অবস্থান ও রোড ব্লক" প্রোগ্রাম বাস্তবায়িত হবে।
তাদের দাবি—
আওয়ামী লীগকে জাতীয় রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে
সমস্ত রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে হবে
স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে হবে
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও দমনমূলক আইনের বিলুপ্তি চাই
আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক আরিফুল ইসলাম বলেন:
“আওয়ামী লীগ একটি সন্ত্রাসী চক্রে পরিণত হয়েছে। এদের রাজনীতি করার অধিকার আর নেই। জনগণের শক্তিই এই দলটিকে রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে মুছে ফেলবে।”
নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা
শাহবাগ এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থানও জোরদার করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবেই চলছে। র্যাব, পুলিশ, ও ডিবি পুলিশের টহল দেখা যাচ্ছে চারপাশে। আন্দোলনকারীরা পরস্পরকে নির্দেশনা দিচ্ছেন শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান চালিয়ে যেতে এবং কোনো ধরনের উস্কানিতে পা না দিতে।
তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব রটেছে যে সরকার আন্দোলন দমন করতে রাতের বেলা অভিযান চালাতে পারে। এ নিয়ে আন্দোলনকারীদের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক থাকলেও তারা বলছেন,
“প্রয়োজনে জীবন দেব, কিন্তু আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ না করে ঘরে ফিরব না।”
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর মধ্যে মাত্র কয়েকটি সাহস করে লাইভ কভারেজ করছে। বেশিরভাগ চ্যানেল রাজনৈতিক চাপের কারণে আন্দোলনের খবরকে এড়িয়ে যাচ্ছে বা সীমিতভাবে উপস্থাপন করছে।
তবে ফেসবুক লাইভ, টুইটার (X), ইউটিউব, এবং টেলিগ্রাম—এইসব প্ল্যাটফর্মে আন্দোলনের প্রচারণা তুঙ্গে। একাধিক হ্যাশট্যাগ এখন ট্রেন্ডিংয়ে রয়েছে:
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সক্রিয় ভূমিকা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, জাহাঙ্গীরনগর, এবং বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সক্রিয়ভাবে এই আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে। তাদের দাবি—এটি কেবল একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার আন্দোলন নয়, বরং এটি একটি গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী বলেন,
“আমরা রাজনীতি বুঝি না, কিন্তু শাসক চক্রের দমননীতি বুঝি। আমরা চাই মুক্ত বাংলাদেশ। আওয়ামী লীগ আমাদের ভবিষ্যত নষ্ট করেছে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে যে রাজনৈতিক অসন্তোষ বিরাজ করছে, এই আন্দোলন তারই একটি বিস্ফোরণ। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের পর এখন একটি রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যেখানে মানুষ বিকল্প নেতৃত্ব খুঁজছে।
তারা মনে করছেন, এই আন্দোলন যদি গণতান্ত্রিক গণ্ডির মধ্যে থাকে এবং সহিংসতামুক্ত থাকে, তবে এটি একটি নতুন রাজনৈতিক ধারার সূচনা করতে পারে। তবে সরকার যদি বলপ্রয়োগে এটি দমন করে, তবে তা আরও রক্তাক্ত ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিতে পারে।
উপসংহার
শাহবাগ আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক মোড় ঘোরানো মুহূর্তের সাক্ষী। হাজার হাজার মানুষের কণ্ঠে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি এখন শুধুই একটি প্রতিবাদ নয়—এটি একটি জাতীয় রূপান্তরের আহ্বান। বাংলাদেশের রাজনীতি কি নতুন একটি যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে? জনগণের দাবি কি প্রতিষ্ঠিত হবে? নাকি আবারো বলপ্রয়োগের ভয়াল মুখ দেখতে হবে?
উত্তর সময়ই দেবে, তবে একথা নিশ্চিত যে বাংলাদেশের মানুষ আর নীরব নয়। তারা জেগে উঠেছে—সংবিধান ও অধিকার রক্ষার জন্য।


0 Comments