টিকটকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বর্ণবাদী ভিডিও ভাইরাল হওয়া একটি উদ্বেগজনক সামাজিক, প্রযুক্তিগত ও নৈতিক সংকট হিসেবে উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণ সংস্থা মিডিয়া ম্যাটার্স সম্প্রতি জানিয়েছে, গুগলের ভিডিও জেনারেশন টুল Veo 3 ব্যবহার করে তৈরি এসব ভিডিও ইতোমধ্যেই কোটি ভিউ ছাড়িয়ে গেছে। এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার, বর্ণবাদী মনোভাবের প্রচার এবং সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলোর নীতিগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এই ভিডিওগুলোতে বিশেষ করে কালো মানুষের প্রতি বিদ্বেষমূলক, অপমানজনক এবং অবমাননাকর উপস্থাপনা লক্ষ্য করা গেছে। কিছু ভিডিওতে কালো নারী চরিত্রকে অশোভন কণ্ঠস্বর, ভুলভাবে ব্যবহৃত আফ্রিকান আমেরিকান ভাষা (AAVE), এবং অতিরঞ্জিত চেহারা দিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে যা সরাসরি সনাতন বর্ণবাদী ‘স্টেরিওটাইপ’-এর ডিজিটাল পুনরাবৃত্তি। এগুলোর মধ্যে এমনও রয়েছে যেখানে কালো চরিত্রদের বানরজাতীয় রূপে দেখানো হয়েছে — যা ইতিহাসে বহুবার ব্যবহৃত হওয়া একটি ভয়াবহ বর্ণবাদী চিত্রকল্প।
সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, টিকটকের অ্যালগরিদম এসব ভিডিওকে ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করছে। TikTok-এর মতো ভিডিও-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে মানুষজনের মনোযোগ ধরে রাখতে "Engagement-Driven" কনটেন্ট বেশি প্রচার করা হয়। ফলে বিতর্কিত, অবমাননাকর বা হাস্যকরভাবে উপস্থাপিত ভিডিওগুলো দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়, যা এসব বর্ণবাদী কনটেন্টের বিস্তারে সহায়ক হচ্ছে।
গুগলের Veo 3 হলো একটি নতুন প্রজন্মের ভিডিও জেনারেশন টুল, যা লিখিত ইনপুটের ভিত্তিতে ভিডিও তৈরি করতে পারে। যদিও গুগল দাবি করেছে এটি নিরাপদ এবং নিয়মের মধ্যে, তবুও ব্যবহারকারীরা এর অপব্যবহার করে কনটেন্ট তৈরি করছে যেগুলো hate speech বা dehumanizing content হিসাবে গণ্য হওয়া উচিত।
এটি শুধু একটি প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা নয়—বরং একটি নৈতিক দুর্বলতা। যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভিডিও প্রযুক্তির অপব্যবহার হয়ে থাকে অন্য কোনো জাতি, ধর্ম বা বর্ণকে অপমান করার কাজে, তখন এটি শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়ার সমস্যা নয়, এটি হয়ে দাঁড়ায় গণমানুষের মানবিক মূল্যবোধে আঘাত।
এই অবস্থায় করণীয় কয়েকটি দিক:
AI নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত নৈতিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করা।
প্ল্যাটফর্মগুলোকে (যেমন TikTok, Instagram) আরও সক্রিয়ভাবে কনটেন্ট মনিটরিং ও রিমুভাল প্রক্রিয়া উন্নত করতে হবে।
সরকার ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উচিত এই ধরনের কনটেন্ট বন্ধে নীতিগত চাপ প্রয়োগ করা।
সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে তারা নিজেরাই এমন কনটেন্ট রিপোর্ট করতে উদ্বুদ্ধ হন।
সবশেষে বলা যায়, এআই প্রযুক্তি যেমন মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হতে পারে, তেমনি এটি মানবিক অবক্ষয় ও বৈষম্য ছড়াতেও ব্যবহৃত হচ্ছে—যদি আমরা এর নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত না করি। এই ঘটনায় আমাদের শিক্ষা নেওয়ার এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার এখনই সময়।

0 Comments