সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঘটে যাওয়া মানবিক এক নাজুক ও উদ্বেগজনক ঘটনা সামাজিক ও স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতালের ওয়ার্ডে প্রবেশের সুযোগ না পেয়ে দুই প্রসূতি নারী বাধ্য হয়ে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের বারান্দায় সন্তান প্রসব করেন। এই পরিস্থিতি শুধু যে চিকিৎসা ও সেবা ব্যবস্থার ব্যর্থতার দিকটি তুলে ধরে তাই নয়, বরং একজন নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা এই দৃষ্টান্তকে আরও করুণ করে তোলে। হাসপাতালের কর্তব্যরত নার্সদের অবহেলা ও অসতর্কতার কারণে এই মানবিক বিপর্যয় ঘটে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা স্থানীয় মানুষের মধ্যে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বুধবার বিকেল সাড়ে চারটার সময় ওই বারান্দায় দুই প্রসূতির সন্তান প্রসব হয়। অভিযোগকারীরা জানাচ্ছেন, তারা নার্সদের কাছে রোগীদের গুরুতর অবস্থা বার বার জানালে ও সাহায্য চাইলেও নার্সরা মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থেকে সিরিয়াল নেবার কথা বলে সময় অপচয় করেন। বারবার অনুরোধের পরও চিকিৎসাসেবায় ন্যূনতম সহানুভূতি বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। এই অবহেলার কারণে রোগীদের প্রাণের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।
স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন উঠে। রোগীর নিরাপত্তা ও সেবার নিশ্চয়তা প্রদান করা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রধান কর্তব্য। কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে, সেবা ব্যবস্থায় এমন অব্যবস্থা ও উদাসীনতা, যা রোগী ও তাদের পরিবারের জন্য মানসিক ও শারীরিক দুঃখ-কষ্টের কারণ হয়েছে। নবজাতকের মৃত্যু এই ঘটনা আরও দুঃখজনক মাত্রা যোগ করেছে।
এ ধরনের ঘটনা হাসপাতালের মান নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মীদের দায়িত্ববোধের গুরুত্বের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। নার্সিং স্টাফদের প্রশিক্ষণ ও মনোযোগী হওয়ার পাশাপাশি হাসপাতালের প্রশাসনিক পর্যায়ের তদারকি ও জরুরি অবস্থা মোকাবেলায় যথাযথ প্রটোকল থাকা অত্যাবশ্যক। রোগীর অবস্থা গুরুতর হলে দ্রুত সেবা প্রদানে বাধা সৃষ্টি করা মানবে না।
এই ঘটনায় হাসপাতালের প্রশাসন তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত যথাযথ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া ও ভবিষ্যতে এমন কোনো ঘটনা যেন না ঘটে সেজন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এছাড়া রোগী সেবা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও স্টাফদের দায়িত্ব পালনের মান উন্নত করার জন্য বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন।
এ ঘটনাটি শুধু সিলেটেই নয়, দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দুর্বল দিকগুলোও সামনে নিয়ে এসেছে। জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, মনোযোগী আচরণ এবং মানবিক মূল্যবোধ বজায় রাখা। রোগী ও তাদের পরিবারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ও জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তির সুযোগ নিশ্চিত করাই সুস্থ ও মানবিক সমাজ গঠনের ভিত্তি।
সর্বোপরি, এই ঘটনার কারণে সমাজে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি আস্থা ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। তাই দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্ত ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়াও জনগণের কাছে এ ব্যাপারে সঠিক তথ্য পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ। যাতে ভবিষ্যতে এমন অমানবিক অবস্থা আর না ঘটে এবং দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বিশ্বমানের পর্যায়ে উন্নীত হয়।

0 Comments