বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের অন্যতম তারকা ঋতুপর্ণা চাকমার জীবন যেন আজ দুই ধরণের লড়াইয়ের এক মিশ্র সম্ভার: একদিকে মাঠের অধিনায়ক হিসেবে তিনি দলকে জয়যাত্রায় এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, অন্যদিকে ব্যক্তিগত জীবনে বুকে সচল রাখা এক কঠিন দায়িত্ব — অসুস্থ মায়ের পরিচর্যা। এই সাংবাদিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২২ সালে ঋতুপর্ণা তাঁর ভাই পার্বণ চাকমার বিদ্যুৎস্পৃষ্ট দুর্ঘটনায় পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকেই তার জীবনে অশান্তির ঝড় বেঁধেছিল । তাঁর বাবাও আগেই না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়ে গেছেন। পরিবারে আর স্বামী নেই; শুধু মা আর তিন বোনের জন্য এখন অটল দায়িত্বজ্ঞান নিয়েই চলছে তার দিনরাত।
বর্তমানে তার মা ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন, নিয়মিত কেমোথেরাপি চালানো হচ্ছে, এবং প্রয়োজনীয় অপারেশনও শীঘ্রই সম্পন্ন করার লক্ষ্যে বাংলাদেশে ফিরবেন তিনি। এই মহতী দায়িত্ব ও মানসিক চাপ যেন মাঠে তার পারফরম্যান্সে প্রতিফলিত হচ্ছে না। তিনি অবিরত গোল করছেন, দলকে জয় এনে দিচ্ছেন এবং সম্প্রতি বায়ুতে বাংলাদেশের মেয়েরা প্রথমবারের মতো এসিআফ নারী এশিয়ান কাপে জায়গা করে নিয়েছে, যার পেছনে ঋতুপর্ণার অবদান একাধিক গোলের মাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসার উদ্রেক করেছে ।
২ জুলাই, যখন বাংলাদেশ সেই জয়ের মাধ্যমে এশিয়ান কাপ নিশ্চিত করে, ঋতুপর্ণা অবিলম্বে ফোন করে মাকে— তার মা বলেছিলেন, তার রোগী মনে হচ্ছে না, বিস্ময়ার সঙ্গে শুনলেন তার মেয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে জেতার খবর। এই ফোনালাপের দৃশ্যই, হয়তো, পরিবারের মর্মস্পর্শী আবেগ ও আশার আলো-উজ্জ্বল একটি মুহূর্ত ছিল।
ঋতুপর্ণার এই সময়ের আবেগঘন সংগ্রাম অনেকখানি প্রতীকী হয়ে দাঁড়িয়েছে: একদিকে অসুস্থ মায়ের জন্য চলমান চিকিৎসা ও অব মধ্যস্থ বিনিয়োগ, অন্যদিকে মাঠে চোখে পড়ার মতো পারফরম্যান্স। সংবাদে বলা হয়েছে, “আমার মা‑ও আক্রান্ত ক্যান্সারে। আমি মায়ের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি… এবার দেশে ফিরে মায়ের অপারেশন করাবো, আশা করি মা দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবেন” । ঠিক সে দৃঢ় প্রত্যয় আর আবেগই আজ তাকে মাঠের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড় করিয়েছে — ধকল যতই বাড়ছে, আত্মবিশ্বাসও ততই দৃঢ় হচ্ছে যেন।
তবে এই উত্থান‐পতনের পথে ঋতুপর্ণা শুধুমাত্র খেলোয়াড় হিসেবেই কাজ করছেন না; তিনি হয়ে উঠেছেন এক সংসার-পরিচালক, তত্ত্বাবধায়ক মেয়ে এবং দায়িত্ব-পুঞ্জ। তার কাছে তার চাওয়া পাওয়া সীমিত— একটি সুস্থ পরিবার এবং দেশের হয়ে অব্যাহত সাফল্য। মাঠে দলের সঙ্গে তার আনন্দ ভাগাভাগি করছেন মায়ের সঙ্গে, এবং পারিবারিক দুঃখ-যন্ত্রণা সামলাতে তিনি নিজের ইচ্ছাশক্তি ও আবেগকে লালন করছেন প্রতিদিন।
এই এক সঙ্গে চলমান দুই যুদ্ধকেন্দ্র — মায়ের অসুস্থতার বিরুদ্ধে আর দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে মর্যাদার লড়াই — ঋতুপর্ণাকে শুধু ফুটবলের মাঠে নয়, জীবনের মাঠেও এক অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করছে। ফুটবল আমাদের এ শিক্ষা দিচ্ছে যে, ব্যক্তিগত দুর্দশা ও পরিবারিক দুঃখের মাঝে থেকেও একজন মানুষের সাহস, দৃঢ়তা এবং অনুপ্রেরণা ধরে রাখা যায়। ঋতুপর্ণা চাকমা হয়তো আজ তার বয়সে কখনো ভাবেননি, জীবনের এত চাপ একসঙ্গে তাকে এভাবে সম্মুখীন হবে। তবুও, আজ তার প্রতিটি গোল, প্রতিটি খেলোয়াড়ি উল্লাসের মুহূর্ত মায়ের চিকিৎসার জন্য সামর্থ্য জোগানো একটি ছোট আলো হয়ে উঠছে — এক নীরব প্রতিজ্ঞা, এক সাহস-উদ্দীপনা, আর এক মায়েদের মুখে খুশির অমোঘ হাসি …

0 Comments