Ticker

6/recent/ticker-posts

Ad Code

মৃত্যু‍‌দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামকে খালাস দিলেন আপিল বিভাগ: বিতর্ক ও প্রতিক্রিয়া

 


বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরেকটি বড় বিতর্ক জন্ম দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালতের একটি রায়। যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামকে খালাস দিয়েছেন বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এই রায় একদিকে যেমন আইনি জটিলতা ও বিচারিক প্রক্রিয়ার গুরুত্বকে সামনে এনেছে, অন্যদিকে তেমনি জাতির মাঝে আতঙ্ক, ক্ষোভ ও বিভাজন তৈরি করেছে।


 কে এই এটিএম আজহারুল ইসলাম?

এটিএম আজহারুল ইসলাম ছিলেন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে পরিচিত আল-বদর বাহিনীর একজন গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার ছিলেন বলে অভিযোগ ছিল।

২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT-BD) তাঁকে গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, এবং অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। বিশেষ করে রংপুরে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের উপর চালানো হামলা ও হত্যাকাণ্ডের জন্য তাঁকে মূলত দায়ী করা হয়।


 আপিল বিভাগ কী বলেছে?

২০২৫ সালের মে মাসে আপিল বিভাগ এই রায়ের চূড়ান্ত শুনানি শেষে রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে বলা হয়, ‍রাষ্ট্রপক্ষ মামলায় “যুক্তিসংগতভাবে সন্দেহাতীতভাবে” অপরাধ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে

বিচারপতিরা উল্লেখ করেন যে,

"প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর সংখ্যা খুবই কম ছিল এবং প্রমাণাদি নানা দিক থেকে অসংগঠিত ও দুর্বল ছিল। একজন নাগরিকের জীবন কেড়ে নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এই ধরনের প্রমাণ যথেষ্ট নয়।"

এজন্য তাঁরা মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে সম্পূর্ণ খালাস দেন।


 রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিক্রিয়া

রাষ্ট্রপক্ষ এই রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ পিটিশনের কথা ভাবছে বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। তিনি বলেন,

“এটি জাতির জন্য হতাশাজনক। যুদ্ধাপরাধের মতো স্পষ্ট ও ইতিহাসভিত্তিক অপরাধে এত বড় একজন আসামিকে খালাস দেওয়া শুধু বিচারব্যবস্থারই প্রশ্ন নয়, এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিও আঘাত।”


 জামায়াত ও সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া

রায় ঘোষণার পরপরই জামায়াত ইসলামীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক বিবৃতি দেওয়া হয়।
তারা বলেছে,

“এটি প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আমাদের নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা করা হয়েছিল। এখন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”

জামায়াতের সমর্থক মহলে ব্যাপক উল্লাস ও আনন্দ মিছিলও হয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানে।


 শহীদ পরিবারের ক্ষোভ

যুদ্ধাপরাধে স্বজন হারানো শহীদ পরিবারের সদস্যরা এই রায়ের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক চাপে এই রায় এসেছে।

একজন শহীদ সন্তানের বক্তব্য:

“আমার বাবা ১৯৭১ সালে এই আজহারুলের নির্দেশে নিহত হয়েছিলেন। আমরা ৫০ বছর পর একটা রায় পেয়েছিলাম। আজ সেই রায় মুছে গেল। তাহলে আমরা কোথায় যাব?”


 আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত

আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মধ্যে রায়টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, আপিল বিভাগ আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তবে অনেকে বলেছেন, বিচারিক প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও রায়টি বিচারব্যবস্থায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দিতে পারে

প্রখ্যাত আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন,

"রায়ের যুক্তির দিকটি বিশ্লেষণ করা উচিত। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, যুদ্ধাপরাধের বিচার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার। এর রায় নিয়ে বিতর্ক থাকলে জাতির মধ্যে বিভাজন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।"


 আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

এখন পর্যন্ত কোনো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা বা রাষ্ট্র এই রায় নিয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। তবে Human Rights Watch-এর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা রায়ের পূর্ণ বিবরণ বিশ্লেষণ করে পজিশন নেবে


রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সন্দেহ

রায়ের সময়ে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের চাপ, এবং আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল প্রসঙ্গ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

অনেকে মনে করছেন, জামায়াতের সঙ্গে কিছু ‘নতুন সমঝোতা’ হতে পারে, যার অংশ হিসেবেই এই রায় এসেছে। যদিও বিষয়টি সরকারি পর্যায়ে অস্বীকার করা হয়েছে।


 ভবিষ্যৎ প্রভাব

এই রায় বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ বিচার প্রক্রিয়ায় একটি বড় ধাক্কা বলে মনে করছেন অনেকেই।
এটি আগামী দিনে,

শহীদ পরিবারগুলোর বিচারপ্রাপ্তির আশায় ধস আনতে পারে।

যুদ্ধাপরাধের অন্য মামলাগুলোতেও সন্দেহ ও প্রশ্ন তুলতে পারে।

রাজনৈতিক পুনঃগঠনে জামায়াতকে পুনরায় গ্রহণযোগ্যতা দেওয়ার চেষ্টা শুরু হতে পারে।


উপসংহার

এটিএম আজহারুল ইসলামের খালাস প্রমাণ করে যে, আইনি প্রক্রিয়ায় দুর্বলতা থাকলে এমন গুরুতর মামলাতেও আসামি মুক্তি পেতে পারেন।
কিন্তু একটি জাতির জন্য, যার জন্ম হয়েছে রক্ত ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে, সেই জাতির জন্য এই রায় আত্মার ক্ষরণ

বিচার পাওয়া কি শুধুই আদালতের প্রক্রিয়া?
নাকি এটি একটি জাতির ইতিহাস ও ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি?

এই প্রশ্নই এখন মানুষের মুখে মুখে।

Post a Comment

0 Comments