ভূমিকা:
বাংলাদেশের কৃষিতে আম উৎপাদন এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ আম উৎপন্ন হয়। তবে, এ আম শুধু দেশের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ না রেখে আন্তর্জাতিক বাজারেও ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল। সেই প্রচেষ্টার একটি বড় সাফল্য হলো – ২৮ মে ২০২৫ তারিখে চীনে রপ্তানির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের আম পাঠানো হচ্ছে। এটি বাংলাদেশের ফল রপ্তানির ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চীনে আম রপ্তানির প্রেক্ষাপট:
চীন বিশ্বের অন্যতম বড় আম আমদানিকারক দেশ। ২০২১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটি বছরে প্রায় ৫০,০০০ টন আম আমদানি করে থাকে। এতদিন ভারত, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন এবং মেক্সিকো ছিল তাদের প্রধান সরবরাহকারী। এবার বাংলাদেশও সেই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে, যা দেশের কৃষি ও রপ্তানি খাতে বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়া:
বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE), কৃষি মন্ত্রণালয় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এই উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। চীনা কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী ফাইটোস্যানিটারি সার্টিফিকেট, হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট, এবং রেসিড্যু-ফ্রি ফার্মিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আম প্রস্তুত করা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সাতক্ষীরা ও নওগাঁ জেলার ফার্মগুলো থেকে রপ্তানিযোগ্য আম সংগ্রহ করা হয়েছে। এই ফার্মগুলোর বেশিরভাগই গ্লোবাল গ্যাপ (Global GAP) সার্টিফায়েড।
রপ্তানির জন্য নির্ধারিত জাত:
চীনে প্রাথমিকভাবে হিমসাগর, লক্ষণভোগ এবং আম্রপালি জাতের আম রপ্তানি করা হচ্ছে। এই জাতগুলো তাদের স্বাদ, গন্ধ ও সংরক্ষণক্ষমতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বেশ জনপ্রিয়।
প্রথম চালানের বিবরণ:
২৮ মে চীনের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া প্রথম চালানে প্রায় ৩০ টন আম পাঠানো হচ্ছে। ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এই চালান বিমানে পরিবহন করা হবে। পরবর্তীতে মাসজুড়ে আরও চালান পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
রপ্তানির দায়িত্বে রয়েছে কয়েকটি স্বনামধন্য কৃষিভিত্তিক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান, যাদের মধ্যে “Golden Agro Exports Ltd.” এবং “Mango Farmers' Cooperative Bangladesh” উল্লেখযোগ্য।
রপ্তানির সুবিধা ও সম্ভাবনা:
চীনে আম রপ্তানির ফলে বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য তৈরি হচ্ছে একটি উন্নত মূল্য প্রাপ্তির সুযোগ। দেশি বাজারে যেখানে প্রতি কেজি আমের দাম ৬০-৮০ টাকা, সেখানে চীনা বাজারে একই আম বিক্রি হচ্ছে ১৫০-২০০ টাকায়। এই উচ্চ মূল্য কৃষকদের আয় বাড়াবে, যা কৃষি খাতকে আরও গতিশীল করবে।
এছাড়াও, এই উদ্যোগে:
কৃষিপণ্য রপ্তানির বহুমুখীকরণ ঘটবে
বিদেশি রেমিট্যান্স বাড়বে
কৃষিজ পণ্যের গুণগত মান উন্নয়নের অনুপ্রেরণা তৈরি হবে
স্থানীয় প্যাকেজিং ও প্রক্রিয়াজাত শিল্প উন্নত হবে
চ্যালেঞ্জ ও করণীয়:
তবে এই রপ্তানি উদ্যোগের কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যেমন:
ফাইটোস্যানিটারি শর্ত পূরণ করা কঠিন
চেইন অব কোল্ড স্টোরেজ ও লজিস্টিকস দুর্বল
কৃষকদের প্রশিক্ষণের অভাব
প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন
এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেরও সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা:
ভারত, পাকিস্তান, মেক্সিকো ও থাইল্যান্ড ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক আম বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। বাংলাদেশ নতুন করে প্রবেশ করায় প্রতিযোগিতাও বাড়বে। তবে বাংলাদেশের আমের স্বাদ, স্বাভাবিক মিষ্টতা এবং রাসায়নিকমুক্ত উৎপাদন পদ্ধতি আমাদের এক অনন্য অবস্থান এনে দিতে পারে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা:
কৃষি মন্ত্রণালয় জানায়, ভবিষ্যতে শুধু চীন নয়, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাজারেও আম রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করছে বিভিন্ন সংস্থা। বিশেষ করে:
রপ্তানিযোগ্য জাতের আমের চাষ সম্প্রসারণ
ফার্মার ট্রেনিং প্রোগ্রাম
প্যাকহাউস স্থাপন ও এক্সপোর্ট কোয়ালিটি প্রসেসিং
উপসংহার:
২৮ মে চীনে আম রপ্তানি বাংলাদেশের কৃষির ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন হিসেবে চিহ্নিত থাকবে। এটি শুধু অর্থনৈতিকভাবেই নয়, বরং দেশের গুণগত পণ্যের প্রতি বিশ্ববাজারের আস্থা অর্জনের প্রমাণও বটে। সঠিক তদারকি, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, রপ্তানিকারকদের উৎসাহ ও সরকারি সহায়তা থাকলে বাংলাদেশ অচিরেই আম রপ্তানিতে একটি উল্লেখযোগ্য অবস্থানে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।
0 Comments