বাংলাদেশ রেলওয়ের সার্বিক উন্নয়ন এবং যাত্রীসেবার মানোন্নয়নে একাধিক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে ভৈরবে পরিচালিত হয়েছে ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি বিরোধী বিশেষ অভিযান। অভিযানে সৌরভ হোসেন (২৫) নামে এক যুবককে আটক করা হয়েছে, যার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ২৯টি ট্রেনের টিকিট এবং একটি স্মার্টফোন। এ ঘটনায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপরতা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।
ঘটনার বিস্তারিত প্রেক্ষাপট
ভৈরব, কিশোরগঞ্জ জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ রেল স্টেশন। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে রাজধানীসহ অন্যান্য অঞ্চলে যাতায়াতের একটি প্রধান কেন্দ্রবিন্দু এটি। বিশেষ করে ঈদ, পূজা, ও সরকারি ছুটির মৌসুমে এখানকার যাত্রীচাপ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ফলে টিকিটের চাহিদা ও সাপ্লাইয়ের মধ্যে ব্যতিক্রম দেখা দেয়। এই সুযোগে কিছু অসাধু ব্যক্তি টিকিট সংগ্রহ করে কালোবাজারি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। যাত্রীদের অভিযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে উদ্যোগী হয়।
অভিযানের সময় ও ধরন
২০২৫ সালের ১ জুন দুপুরে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি), রেল পুলিশ (জিআরপি) ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ভৈরব রেল স্টেশনে অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে সাদা পোশাকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা স্টেশনের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন এবং সন্দেহজনক ব্যক্তিদের উপর নজরদারি শুরু করেন।
এক পর্যায়ে সৌরভ হোসেন নামের এক যুবকের আচরণে সন্দেহ হলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। তার দেহ তল্লাশি ও মোবাইল ফোন যাচাই-বাছাই করার পর তার ব্যাগ থেকে উদ্ধার করা হয় মোট ২৯টি ট্রেনের টিকিট, যেগুলোর প্রতিটি বিভিন্ন এনআইডি নম্বর ব্যবহার করে কেনা হয়েছিল। এছাড়াও তার কাছ থেকে একটি স্মার্টফোন জব্দ করা হয়, যার মাধ্যমে সে টিকিট বুকিং দিত এবং গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত।
গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির পরিচয়
সৌরভ হোসেন (২৫), কিশোরগঞ্জ জেলারই বাসিন্দা। সে দীর্ঘদিন ধরে ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে। অনলাইনে ও অফলাইনে টিকিট বুকিং করার দক্ষতা থাকায় সে সাধারণ যাত্রীদের আইডি ব্যবহার করে আগাম টিকিট সংগ্রহ করত এবং পরে তা বাড়তি দামে বিক্রি করত। এতে সে প্রতিদিন কয়েক হাজার টাকা অবৈধভাবে আয় করত।
আইনি ব্যবস্থা ও মামলার অগ্রগতি
ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাকে "রেলওয়ে আইন ১৮৯০" এবং "বিশেষ ক্ষমতা আইন" এর আওতায় দোষী সাব্যস্ত করে জরিমানা ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিযানের প্রমাণ হিসেবে জব্দকৃত টিকিট ও স্মার্টফোন আদালতে উপস্থাপন করা হবে। তার মোবাইল থেকে কালোবাজারি সিন্ডিকেটের অন্যান্য সদস্যদের তথ্য সংগ্রহ করে আরও অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
রেলওয়ের পক্ষ থেকে বার্তা
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, যাত্রীদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই ধরনের কালোবাজারির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হবে। নতুন প্রযুক্তি সংযোজন করে টিকিট বুকিংয়ের সময় একই এনআইডি দিয়ে একাধিক টিকিট সংগ্রহ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে কালোবাজারিদের চিহ্নিত করতে সফটওয়্যার পর্যায়ে সতর্কতা ব্যবস্থা সংযোজনের কথাও জানানো হয়েছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন,
“আমরা চাচ্ছি প্রতিটি যাত্রী যেন অনায়াসে টিকিট কিনে তার গন্তব্যে যেতে পারেন। যারা এই ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে অবৈধভাবে লাভবান হচ্ছে, তাদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।”
স্থানীয় জনগণের প্রতিক্রিয়া
ভৈরবের স্থানীয় যাত্রী ও সাধারণ মানুষ এই অভিযানে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। একজন যাত্রী বলেন,
“গত সপ্তাহে টিকিট পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তবুও পাইনি। অথচ পরে শুনি টিকিট কালোবাজারিতে বিক্রি হয়েছে দ্বিগুণ দামে। আজকের অভিযান দেখে মনে হচ্ছে আমরা যাত্রীরাও নিরাপত্তা ও ন্যায্যতার প্রত্যাশা করতে পারি।”
সামাজিক সচেতনতা এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা
অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তা স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। অনেকে রেলওয়ের প্রশংসা করে আরও সুশৃঙ্খল ও প্রযুক্তিনির্ভর টিকিটিং সিস্টেম গঠনের আহ্বান জানান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই লিখেছেন,
“প্রতিটি স্টেশনে নিয়মিত এমন অভিযান চালালে কালোবাজারিরা আর সাহস পাবে না।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যৌথভাবে কালোবাজারি নির্মূলের লক্ষ্যে বেশ কিছু পরিকল্পনা নিয়েছে, যেমন:
-
টিকিট বুকিংয়ে এনআইডি ভেরিফিকেশন জোরদার
-
একই মোবাইল নম্বর ও এনআইডিতে টিকিট সীমিতকরণ
-
অনলাইন ট্র্যাকিং ও ম্যানুয়াল অডিটিং পদ্ধতির উন্নয়ন
-
রেল স্টেশনে সিসিটিভি ক্যামেরা ও নজরদারি বৃদ্ধি
-
স্টাফদের প্রশিক্ষণ ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার
উপসংহার
ভৈরবে পরিচালিত এই অভিযান রেলওয়ের টিকিট ব্যবস্থা স্বচ্ছ করার পথে একটি বড় পদক্ষেপ। কালোবাজারি একটি সামাজিক ব্যাধি, যা কেবল রেল ব্যবস্থাকেই নয়, সাধারণ মানুষের ভোগান্তিকেও বাড়িয়ে দেয়। প্রশাসনের সক্রিয়তা এবং জনগণের সচেতনতা একত্রে কাজ করলে, এই ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব। সৌরভ হোসেনের গ্রেফতার সেই পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয় যে, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

0 Comments