ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলার বহু এলাকায় আসন্ন সোমবার (২ জুন) গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকবে। গ্যাস পাইপলাইনের জরুরি স্থানান্তর কাজের কারণে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত টানা ১২ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
এই সময়ের মধ্যে আবাসিক, বাণিজ্যিক এবং শিল্প খাতে গ্যাসভিত্তিক কাজ বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রেস্টুরেন্ট, কারখানা, হাসপাতালসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় গ্যাসভিত্তিক সেবা বন্ধ থাকবে। এতে চরম ভোগান্তির আশঙ্কায় রয়েছেন হাজারো মানুষ।
যেসব এলাকায় গ্যাস থাকবে না
তিতাস গ্যাসের দেওয়া বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে নিচের এলাকাগুলোতে:
ঢাকা মহানগরীর এলাকা:
মিরপুর ১০, ১১, ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর
পল্বী, রূপনগর, কালশী, কচুক্ষেত
শ্যামলী, মোহাম্মদপুর, আদাবর
আগারগাঁও, কল্যাণপুর, তেজগাঁও
ফার্মগেট, ধানমন্ডি, গ্রিন রোড
রায়েরবাজার, বসিলা
উত্তরা ৯-১৪ নম্বর সেক্টর
নারায়ণগঞ্জ জেলার এলাকা:
ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, শিমরাইল
চিটাগাং রোড, হিজলতলা, পাগলা
কিছু অংশের রূপগঞ্জ
এছাড়াও আশেপাশের ছোট ছোট এলাকা ও সংযোগগুলোও এই সময় গ্যাসহীন থাকবে।
কাজের কারণ ও প্রয়োজনীয়তা
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, একটি মূল গ্যাস পাইপলাইনের স্থানান্তর ও উন্নয়ন কাজ করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে স্থাপিত পুরনো পাইপলাইন অনেক স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিশেষ করে মিরপুর-শ্যামলী-তেজগাঁও এলাকা হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত চলমান পাইপলাইনটির রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।
তিতাস কর্তৃপক্ষ বলেছে:
“নতুন অবকাঠামো প্রকল্পের কাজের সুবিধার্থে পুরনো পাইপলাইন স্থানান্তর করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে ভাল্ব, সংযোগ ও নিরাপত্তামূলক ফিটিংস স্থাপন করা হবে।”
এই কাজ শেষ হলে ভবিষ্যতে ওইসব এলাকায় গ্যাসের চাপ ও সাপ্লাই আগের তুলনায় উন্নত হবে বলেও জানানো হয়েছে।
আবাসিক গ্রাহকদের ভোগান্তি
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়বেন আবাসিক ব্যবহারকারীরা। সকালে রান্নার সময় গ্যাস না থাকায় সকাল-দুপুরের খাবার তৈরিতে বাধা আসবে। বিকেল বা রাতে গ্যাস ফিরে এলেও অনেকেই রান্না শেষ করতে পারবেন না সময়মতো।
ধানমন্ডির এক গৃহবধূ বলেন:
“বাসায় ছোট বাচ্চা আছে। সকাল-সন্ধ্যার রান্না না করতে পারলে কীভাবে দিন পার করবো বুঝতে পারছি না। মাইক্রোওভেন থাকলেও সেটা দিয়ে তো সব করা যায় না।”
অনেকে আগেই পরিকল্পনা করছেন বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার— কেউ হটপ্লেট বা ইনডাকশন কুকার ব্যবহার করছেন, কেউ বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করার কথা ভাবছেন।
বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও রেস্তোরাঁগুলো বিপাকে
ঢাকার ছোট-বড় রেস্তোরাঁ, হোটেল ও খাবার হাউজগুলো একদিনের গ্যাস না থাকলে কার্যত অচল হয়ে পড়ে। সকাল-বিকাল ব্যস্ত সময়গুলোতে রান্না না করতে পারায় অনেকেই অর্ডার বাতিল করতে বাধ্য হন।
তেজগাঁওয়ের একটি ফুড ডেলিভারি প্রতিষ্ঠানের মালিক বলেন:
“দিনে ১০০+ অর্ডার যাই, গ্যাস না থাকলে সেই খাবার তৈরিই সম্ভব হবে না। এতে কাস্টমার হারানোর শঙ্কা থাকে।”
বিশেষ করে যেসব হোটেল-রেস্টুরেন্ট প্রাকৃতিক গ্যাস নির্ভর, তাদের কোনো বিকল্প না থাকলে পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হবে সার্ভিস।
শিল্প খাত ও উৎপাদন ব্যাহত
নারায়ণগঞ্জে বহু গার্মেন্টস, ডাইং, টেক্সটাইল ও প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে যেগুলোর বড় একটি অংশ গ্যাস নির্ভর। দিনভর গ্যাস না থাকলে উৎপাদন কার্যক্রমে বড় প্রভাব পড়বে।
রূপগঞ্জের একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির ব্যবস্থাপক বলেন:
“একদিন গ্যাস না থাকলে আমাদের প্রায় ২০ হাজার পিস কাপড় ফিনিশিং আটকে যাবে। সেটা পরে ম্যানেজ করতে অনেক সমস্যা হয়।”
ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে অতিরিক্ত শিফট বা বিকল্প জেনারেটর ব্যবহারের চিন্তা করছে।
স্বাস্থ্য খাত ও হাসপাতালেও প্রভাব
চিকিৎসা সেবায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ— বিশেষ করে যেসব হাসপাতাল বা ক্লিনিকে গরম পানি, ওটি স্টেরিলাইজেশন বা হাসপাতালের রান্না কাজ গ্যাসের মাধ্যমে চলে।
তিতাস জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশেষ ব্যাকআপ বা অস্থায়ী সংযোগের বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে যেসব ক্লিনিকে এমন ব্যবস্থা নেই, তারা সমস্যায় পড়তে পারে।
তিতাসের অনুরোধ ও সতর্কতা
তিতাস গ্যাস জানিয়েছে, গ্রাহকরা যেন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গ্যাস চুলা বন্ধ রাখেন এবং গ্যাস আসার সময় খেয়াল রেখে সচেতন থাকেন। কারণ অনেক সময় গ্যাস ফিরে এলে অজান্তে খোলা চুলা থেকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে।
তিতাসের এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার বলেন:
“রাত ৮টার মধ্যে আমরা কাজ শেষ করে গ্যাস চালু করবো। তবে গ্যাস আসতে ধাপে ধাপে কিছু সময় লাগবে। সবাইকে সতর্ক থাকতে অনুরোধ করছি।”
জনপ্রতিক্রিয়া ও পরামর্শ
অনেক নাগরিক তিতাসের সিদ্ধান্তে সমর্থন জানালেও রক্ষণাবেক্ষণের সময়সূচি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন, রাতের সময় কাজ করলে ভোগান্তি কম হতো।
একজন টুইটার ব্যবহারকারী লেখেন:
“রাত ১০টা থেকে ভোর ৫টা— এই সময়টা ব্যবহার করলে সাধারণ মানুষ এত সমস্যায় পড়তো না। দিনের পুরোটা সময় গ্যাস বন্ধ রাখা অমানবিক।”
উপসংহার
গ্যাস পাইপলাইনের আধুনিকায়ন ও নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সময়োপযোগী রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে জনজীবনের দুর্ভোগও কমিয়ে আনতে হলে সময় নির্ধারণে আরো যুক্তিসঙ্গত হওয়া দরকার।
সরকার ও তিতাস যদি ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে গ্যাস বন্ধ করে রক্ষণাবেক্ষণ পরিচালনা করে কিংবা রাতে এই ধরনের কাজ করে, তাহলে জনগণের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে।
0 Comments