সারাদেশে মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তার কারণে আজ রাত ১০টার মধ্যেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র বজ্রপাত ও ভারি বর্ষণের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের কিছু কিছু জেলায় ঝড়ো হাওয়া, বজ্রঝড় ও অতি বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। আবহাওয়াবিদদের ভাষ্যমতে, এটি হতে পারে চলতি মৌসুমের একটি উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাতের ঘটনা।
আবহাওয়ার বর্তমান চিত্র ও পূর্বাভাস
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী:
“আজ সন্ধ্যার পর থেকে রাত ১০টার মধ্যে ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল ও রংপুর বিভাগের ওপর দিয়ে বজ্রসহ বৃষ্টিপাত এবং কোথাও কোথাও দমকা/ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। কিছু এলাকায় ৭০-৮০ কিমি/ঘণ্টা বেগে বাতাস বইতে পারে।”
এই পরিস্থিতির মূল কারণ হলো বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া একটি লঘুচাপ, যা ক্রমশ শক্তি সঞ্চয় করে উপকূলের দিকে এগোচ্ছে। এর প্রভাবে দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে আর্দ্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এতে করে আবহাওয়া অস্থির হয়ে উঠেছে।
প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য: কেন এই বৃষ্টিপাত ও বজ্রপাত?
বাংলাদেশে মে-জুলাই মাসে সাধারণত বর্ষাকালের শুরু হয়। এই সময়টিতে:
মৌসুমি বায়ু শক্তিশালী হয়।
বঙ্গোপসাগরে তৈরি হয় ঘূর্ণিঝড়, নিম্নচাপ ও লঘুচাপ।
আর্দ্রতা বেড়ে যায়, ফলে বায়ুমণ্ডলে উচ্চ ও নিম্নচাপের পার্থক্য থেকে বজ্রঝড় তৈরি হয়।
এই মুহূর্তে যে বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, তা হচ্ছে কনভেকটিভ বজ্রঝড়। অর্থাৎ, ভূপৃষ্ঠের উষ্ণ বাতাস ওপরে উঠে গিয়ে ঠাণ্ডা বাতাসের সংস্পর্শে এসে বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি করে। এই ধরনের ঝড় সাধারণত হঠাৎ করে শুরু হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যে প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে হাজির হয়।
বজ্রপাতের ঝুঁকি: জীবন ও সম্পদ রক্ষায় করণীয়
বাংলাদেশে প্রতি বছর বজ্রপাতে গড়ে ২০০-২৫০ জনের মৃত্যু ঘটে। এই সংখ্যা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত মৃত্যুর তুলনায় অনেক বেশি। তাই এই ধরনের পূর্বাভাসকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
বজ্রপাত থেকে বাঁচার জন্য করণীয়:
খোলা মাঠ, ধানক্ষেত, জলাশয় থেকে দূরে থাকুন।
গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া বিপজ্জনক—এটি এড়িয়ে চলুন।
ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার এ সময় বন্ধ রাখুন।
মোবাইল ফোন বন্ধ রাখুন বা ‘এয়ারপ্লেন মোড’-এ রাখুন।
ধাতব বস্তু (ছাতা, গহনা, রড) বহন না করাই ভালো।
বাড়ির মধ্যে থাকলেও জানালার পাশে দাঁড়াবেন না।
বিশেষ করে কৃষক, মৎস্যজীবী ও খোলা জায়গায় কাজ করা শ্রমিকদের জন্য এ সময় সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
বিশেষ সতর্কতা সমুদ্র উপকূল ও নদীবন্দর এলাকায়
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে স্থানীয় সংকেত নম্বর ৩ জারি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পায়রা ও মংলা বন্দরের জন্য এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মৎস্যজীবীদের গভীর সমুদ্রে না যাওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
নৌযান ও ট্রলারগুলোকে উপকূলে নিরাপদে অবস্থানের নির্দেশ রয়েছে।
এছাড়া, নদীবন্দরগুলোতেও ১ নম্বর সতর্কতা সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে, যেটি বোঝায় যে ঝড়ো হাওয়া ও বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।
ঢাকায় সম্ভাব্য প্রভাব
ঢাকা শহরে আজ সন্ধ্যা থেকেই কালো মেঘে আকাশ ঢাকা পড়ে। বিভিন্ন এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের ধারণা, রাত ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে ঢাকায় মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণ হতে পারে, সাথে বজ্রপাত ও ৫০-৬০ কিমি/ঘণ্টা বেগে ঝড়ো হাওয়া বইবে।
বিশেষ করে ঢাকার নিম্নাঞ্চলগুলোতে জলাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে। তাই নগরবাসীদের প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পথচারী ও যানবাহন চালকদের জন্য পরামর্শ
বৃষ্টির সময় গাড়ি ও মোটরসাইকেল সাবধানে চালান।
ফ্লাইওভার ও উঁচু স্থানে ঝড়ো হাওয়া বেশি প্রবল হতে পারে।
দৃষ্টিসীমা কমে যেতে পারে, তাই হেডলাইট জ্বালিয়ে চালান।
পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাস
আবহাওয়া অফিস জানাচ্ছে, এই বৃষ্টিপাতের প্রবণতা পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে:
রোববার ভোরের দিকে সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের মাত্রা আরও বাড়তে পারে।
ঢাকায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত চলমান থাকবে।
দেশের উত্তরাঞ্চলে কিছু এলাকায় শিলা বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে।
পরিশেষে: সাবধানতাই উত্তম প্রতিরোধ
আবহাওয়ার এই হঠাৎ রূপ পরিবর্তনের মধ্যে সচেতনতা ও পূর্বপ্রস্তুতি থাকতে হবে আমাদের সবার। রাত ১০টার মধ্যে যে তীব্র বজ্রপাত ও ভারি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে, তা একদিকে স্বস্তিদায়ক (তাপপ্রবাহ প্রশমনে সহায়ক), আবার অন্যদিকে জীবন ও সম্পদের জন্য হুমকিস্বরূপ।
আবহাওয়ার প্রতিটি আপডেট অনুসরণ করুন, বুলেটিনে চোখ রাখুন, আর পরিবারের সবাইকে আগেভাগে সাবধান করুন।

0 Comments