ভারতীয় চলচ্চিত্র ও থিয়েটার জগতে যাঁরা নিয়মিত খোঁজ রাখেন, তাঁদের কাছে অনির্বাণ ভট্টাচার্য একটি পরিচিত ও শ্রদ্ধার নাম। বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ, অনবদ্য অভিনয়শৈলী এবং নিখুঁত চরিত্র রূপায়ণের মাধ্যমে তিনি নিজেকে অভিনয়ের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। শুধু বাংলা চলচ্চিত্র বা থিয়েটার নয়, তাঁর কাজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও জায়গা করে নিচ্ছে।
সম্প্রতি এমনই একটি আন্তর্জাতিক প্রজেক্টে অংশ নিতে গিয়ে অনির্বাণ পাড়ি জমান নাইজেরিয়ার লাগোস ফিল্মসিটিতে। ছবির নাম "No News Only Flesh"—একটি ইংরেজি ভাষার ইন্ডিপেনডেন্ট ফিল্ম, যেখানে অনির্বাণকে দেখা যাবে একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে।
তবে শুটিংয়ের মাঝপথেই ঘটে এক অনভিপ্রেত ঘটনা—এক বিশেষ স্থানীয় খাবার খেয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন এই প্রতিভাবান অভিনেতা।
নাইজেরিয়ায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সূচনা
আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনির্বাণ সপ্তাহ দুয়েক আগে কলকাতা থেকে নাইজেরিয়ায় উড়াল দেন। তার আগে থেকেই ছবিটির প্রযোজক এবং পরিচালক দলের সঙ্গে বিভিন্ন ভার্চুয়াল বৈঠকে তাঁর অংশগ্রহণ চলছিল। অনির্বাণের অভিনয় দক্ষতা এবং সংলাপ বলার ধরনে পরিচালক এতটাই মুগ্ধ হন যে, একটি ক্যামিও চরিত্রে তাঁকে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
অনির্বাণ নিজেও এই অভিজ্ঞতা নিয়ে বেশ আশাবাদী ছিলেন। অন্য সংস্কৃতির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাওয়া, আন্তর্জাতিক সহকর্মীদের সঙ্গে পরিচয়, আর ভিন্ন ভৌগলিক পরিবেশে অভিনয়ের রোমাঞ্চ—সব মিলিয়ে অনির্বাণ ছিলেন দারুণ উৎসাহিত।
শুটিংয়ের মাঝপথে অপ্রত্যাশিত বিপত্তি
লাগোস শহরে শুটিং শুরু হয় এক সপ্তাহের মাথায়। দিনভর কাজ শেষে, শুটিং ইউনিটের সদস্যদের সঙ্গে স্থানীয় এক জনপ্রিয় খাবার দোকানে যান অনির্বাণ। সেখানেই তাঁকে চেখে দেখতে দেওয়া হয় নাইজেরিয়ার এক বিশেষ খাবার, যা মূলত স্থানীয় প্রোটিন সমৃদ্ধ মাংস ও নানা ধরনের মসলা দিয়ে তৈরি।
এই খাবার খাওয়ার পরপরই অনির্বাণ হঠাৎ করেই শারীরিকভাবে অস্বস্তি অনুভব করেন। শুরুতে সবাই ভেবেছিলেন এটি হালকা খাবার জনিত অস্বস্তি। কিন্তু পরে দেখা যায়, তাঁর পেট ব্যথা বেড়ে যাচ্ছে, সঙ্গে হালকা জ্বর এবং দুর্বলতাও দেখা দেয়। শুটিং ইউনিটের পক্ষ থেকে দ্রুত তাঁকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
চিকিৎসা ও আশ্বস্ততা
চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, এটি ফুড অ্যালার্জি বা ফুড পয়জনিংয়ের কারণে ঘটেছে। হয়তো অনির্বাণের শরীর কিছু নির্দিষ্ট মশলা বা রান্নার ধরন সহ্য করতে পারেনি। প্রয়োজনীয় স্যালাইন ও ওষুধ দেওয়ার পর অনির্বাণের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়।
পরবর্তীতে আনন্দবাজার পত্রিকার পক্ষ থেকে অনির্বাণের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন:
“এটা খুব একটা বড় কিছু না। স্থানীয় একটি খাবার খেয়ে পেট খারাপ হয়েছিল। তবে চিকিৎসকেরা খুব ভালোভাবে যত্ন নিয়েছেন। এখন অনেকটাই সুস্থ। নতুন জায়গা, নতুন অভিজ্ঞতা—এই তো জীবন।”
তাঁর এই মন্তব্যে দেখা যায়, অনির্বাণ বরাবরের মতোই দারুণভাবে পরিস্থিতি সামলে নিয়েছেন। একদিকে শারীরিক অস্বস্তি, অন্যদিকে বিদেশে থাকা—তবুও তিনি নিজের পেশাদারিত্বের সাথে সামঞ্জস্য রেখেছেন।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাঙালি অভিনেতা
অনির্বাণের মতো একজন শিল্পীর আন্তর্জাতিক প্রজেক্টে কাজ করাটা শুধুই ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের অগ্রগতি নয়, এটি বাংলা সংস্কৃতি এবং অভিনয়ের জন্যও একটি গর্বের বিষয়। “No News Only Flesh” ছবিটি মূলত মানবিক অস্তিত্ব, সংস্কৃতিগত সংঘাত এবং আধুনিক সমাজের অবক্ষয় নিয়ে তৈরি একটি আভিনব গল্প।
এই ছবিতে অনির্বাণের চরিত্রটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তা বহন করে, যদিও পর্দায় সময় খুব কম। পরিচালকের মতে, এই চরিত্রে এমন একজন অভিনেতা দরকার ছিল, যিনি স্বল্প সময়েও দর্শকের মনে প্রভাব ফেলতে পারেন। আর এই জায়গাতেই অনির্বাণ অদ্বিতীয়।
শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা ও সংস্কৃতির মিলন
অনির্বাণ জানিয়েছেন, নাইজেরিয়ার ফিল্মসিটিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর জন্য একদম নতুন। সেখানকার শুটিং ইউনিট, ব্যবস্থাপনা, টেকনিক্যাল টিম—সব কিছুই তাঁর জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন:
“তাদের কাজের পদ্ধতি আমাদের থেকে ভিন্ন, কিন্তু খুবই পেশাদার। ভাষা ভিন্ন হলেও আন্তরিকতায় কোনো কমতি নেই।”
অনির্বাণের মতে, এমন আন্তঃসাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা একজন শিল্পীকে আরও পরিপক্ব করে তোলে।
বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য নতুন দিগন্ত
এই অভিজ্ঞতা শুধু অনির্বাণের ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি বাংলা সিনেমার জন্যও দারুণ একটি বার্তা। আমাদের অভিনেতারা এখন কেবল আঞ্চলিক নয়, আন্তর্জাতিক সিনেমার অংশও হয়ে উঠছেন। নতুন প্রজন্মের অভিনেতা ও নির্মাতাদের জন্য এটি একটি অনুপ্রেরণা।
উপসংহার
নাইজেরিয়ায় গিয়ে স্থানীয় খাবারে সাময়িক অসুস্থতা অনির্বাণ ভট্টাচার্যের কর্মজীবনের এক ছোট অধ্যায় হলেও, এটি এক বৃহৎ যাত্রার ইঙ্গিত বহন করে। তাঁর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে কাজ করা, নতুন অভিজ্ঞতা নেওয়া এবং কঠিন পরিস্থিতি সামলে নেওয়া প্রমাণ করে তিনি একজন প্রকৃত শিল্পী।
আমরা আশা করি তিনি দ্রুত সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবেন এবং সিনেমাটির শুটিং সফলভাবে শেষ করবেন। “No News Only Flesh” ছবিতে তাঁর পারফরম্যান্স আমাদের জন্য গর্বের বিষয় হবে এবং বিশ্বমঞ্চে বাঙালি অভিনয়ের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠবে।

0 Comments