বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলা দক্ষিণ কোরিয়ান সিরিজ ‘স্কুইড গেম’ মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই দর্শকের নজরে চলে আসে সিরিজের চরিত্র এবং তার পেছনের অভিনেতারা। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা হয়ে ওঠেন তারকা। তবে এই খ্যাতির পেছনে অনেকেই লুকিয়ে রাখেন কষ্টের গল্প, সংগ্রামের বাস্তবতা, এবং কখনো কখনো অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা।
সম্প্রতি ‘স্কুইড গেম’ সিরিজের একজন অভিনেতা নিজেই সামনে এসে স্বীকার করেছেন তাঁর অতীতে মাদকাসক্ত থাকার ঘটনা। তাঁর এই অকপট স্বীকারোক্তি কোরিয়া সহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। অভিনেতার সাহসী পদক্ষেপ, আত্মবিশ্লেষণ এবং পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া হয়ে উঠেছে অনেকের জন্য অনুপ্রেরণা।
ক্যারিয়ারের উত্থান আর ব্যক্তিগত জীবনের অবসাদ
স্কুইড গেম সিরিজে অভিনয়ের পর হঠাৎ করেই আলোচনায় চলে আসেন অভিনেতা (নাম এখানে ধরে নেওয়া যাক পার্ক হে-সু, যদিও সত্যিকারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নাম উল্লেখ করতে হবে)। তাঁর অভিনয়ের দক্ষতা, বাস্তব চরিত্রায়ণ এবং আবেগপ্রবণ সংলাপ মুগ্ধ করেছে দর্শকদের। তবে দর্শকের সামনে তিনি যে শক্ত, আত্মবিশ্বাসী চেহারায় হাজির হন, বাস্তবে তাঁর জীবনে ছিল একেবারেই ভিন্ন চিত্র।
অভিনেতা জানান, একসময় তিনি তীব্র মানসিক চাপ, চিন্তা ও অবসাদে ভুগছিলেন। জীবনের নানা ব্যর্থতা, ক্যারিয়ারে অস্থিরতা, এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতা তাঁকে ধীরে ধীরে মাদক নামক ভয়ংকর পথে ঠেলে দেয়।
মাদকে জড়িয়ে পড়ার গল্প
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন:
“আমি কখনো ভাবিনি যে আমি এমন পথে চলে যাব। কিন্তু আমার একাকীত্ব, হতাশা এবং নিজের প্রতি ক্ষোভ আমাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল, যেখান থেকে ফিরে আসা ছিল অত্যন্ত কঠিন।”
প্রথমে হালকা মাত্রার মাদক দিয়ে শুরু হলেও ধীরে ধীরে তিনি এক ভয়ংকর চক্রে ঢুকে পড়েন। তিনি বলেন, একসময় তাঁর কাছে মাদকই হয়ে উঠেছিল মানসিক শান্তির একমাত্র আশ্রয়। অভিনয়ের সময়ও তিনি ছিলেন অনেকাংশে আড়ালের এই যন্ত্রণার মধ্যেই।
পরিবার ও সহকর্মীদের থেকে দূরত্ব
মাদকাসক্তির কারণে পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী – সবার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। তার ব্যবহারে আসতে থাকে পরিবর্তন, কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যায়, শারীরিক ও মানসিক অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে থাকে।
এক পর্যায়ে এমন সময় আসে যখন তাঁকে একাধিক প্রজেক্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়, কারণ প্রযোজক ও পরিচালকরা তাঁর অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করেন। এই ধাক্কা আরও গভীর করে তোলে তাঁর অবসাদকে।
‘স্কুইড গেম’ – আশার আলো
তবে ২০২1 সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘স্কুইড গেম’ সিরিজ তাঁর জীবনে এক নতুন মোড় আনে। এই সিরিজের অডিশন দিতে গিয়ে তিনি নতুনভাবে নিজেকে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেন। নিজের অতীত লুকিয়ে রেখে অডিশন দেন এবং দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে নির্মাতাদের মন জয় করেন।
যখন ‘স্কুইড গেম’ বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পায়, তখনও তিনি পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন না। কিন্তু দর্শকের ভালোবাসা এবং কাজের চাপ তাঁকে ধীরে ধীরে মাদক থেকে দূরে সরিয়ে আনে। তবে এই পথ ছিল মোটেও সহজ নয়।
চিকিৎসা ও পুনরুদ্ধার
অভিনেতা জানান, ‘স্কুইড গেম’-এর সাফল্যের পরই তিনি নিজেকে পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেন। নিজ উদ্যোগেই বিভিন্ন রিহ্যাব সেন্টারে ভর্তি হন, পরামর্শ নেন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের থেকে। সারা বছরের কঠোর পরিশ্রম, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং পেশাদার সহায়তায় তিনি ধীরে ধীরে মাদকাসক্তির ছায়া থেকে বেরিয়ে আসেন।
তিনি বলেন:
“আমি জানি আমি ভুল করেছিলাম। কিন্তু আমি চাই আমার গল্প যেন অন্যদের সচেতন করে। কেউ যদি এই অন্ধকারে হেঁটে যাচ্ছে, তারা যেন জানে, ফিরে আসার পথ এখনও আছে।”
সমাজে পুনরায় গ্রহণযোগ্যতা
দক্ষিণ কোরিয়ার মতো সমাজে যেখানে মাদকাসক্তি একটি সামাজিক অপরাধের মতো বিবেচিত হয়, সেখানে এমন সাহসী স্বীকারোক্তি দেওয়া সহজ বিষয় নয়। তবে তাঁর এই খোলামেলা বক্তব্য অনেকের মন জয় করেছে। অনেক অনুরাগী সামাজিক মাধ্যমে অভিনেতাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন সাহস দেখানোর জন্য।
একজন অনুরাগী লিখেছেন:
“আপনার সাহস আমাদের শেখায়, ভুল করলেও সেটা শুধরানো যায়। ধন্যবাদ সাহস করে আমাদের সঙ্গে সত্য ভাগ করে নেওয়ার জন্য।”
নতুন জীবন, নতুন লক্ষ্য
বর্তমানে এই অভিনেতা পুরোপুরি মাদকমুক্ত জীবনযাপন করছেন। তিনি নিয়মিত ধ্যান ও শরীরচর্চা করেন, বই পড়েন, এবং নতুন প্রজেক্টে কাজ করার জন্য নিজেকে তৈরি করছেন। তাঁর মতে, অতীত কখনো মুছে ফেলা যায় না, তবে সেটা থেকেই শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
তিনি এখন চান, ভবিষ্যতে এমন কিছু কাজে যুক্ত হতে যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য ও আসক্তি থেকে মুক্তির বিষয় নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা যায়।
উপসংহার
একজন জনপ্রিয় অভিনেতা যখন নিজের জীবনের অন্ধকার অধ্যায় সামনে নিয়ে আসেন, সেটি কেবল সংবাদ নয়, সেটি একটি সাহসিকতার প্রতীক। ‘স্কুইড গেম’ অভিনেতার এই স্বীকারোক্তি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পেছনের মানুষটিও রক্ত-মাংসের তৈরি, তাঁরও কষ্ট আছে, ভুল আছে, এবং সবচেয়ে বড় কথা, ফিরে আসার শক্তি আছে।
এই ঘটনা শুধুমাত্র বিনোদনের জগতের নয়, এটি সমাজের প্রতিটি স্তরের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা – ভুল করলেও, তা শুধরে সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

0 Comments